ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। ঝড়টির নাম ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়ের নাম কে রাখে, কীভাবে এই নাম নির্বাচন করা হয় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের নামকরণের প্রয়োজনই বা কেন?
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কোনো ব্যক্তি বা একটি দেশের ইচ্ছামতো হয় না। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসক্যাপ) অধীন আঞ্চলিক প্যানেলের নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়। এ ব্যবস্থায় বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ অংশ নেয়।
নাম প্রস্তাব করে ১৩টি দেশ;
বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের জন্য বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন নাম প্রস্তাব করে।
দেশগুলো আগে থেকেই নির্দিষ্টসংখ্যক নাম জমা দেয়। ২০২০ সালে প্রকাশিত তালিকায় ১৩টি দেশের প্রস্তাবিত মোট ১৬৯টি নাম রয়েছে। নির্ধারিত ক্রম অনুসারে এসব নাম ব্যবহার করা হয়। উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় নামকরণের দায়িত্ব পালন করে ভারতের আবহাওয়া বিভাগের অধীন নয়াদিল্লির আঞ্চলিক বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র (আরএসএমসি)।
এবারের ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর নাম প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। নামটি ইংরেজিতে ‘Arnab’ লেখা হয় এবং এর উচ্চারণ ‘অর্ণব’। তবে বাংলাদেশ নাম প্রস্তাব করলেও ঘূর্ণিঝড়টি যে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। নামের সঙ্গে ঝড়ের গতিপথ বা আঘাত হানার স্থানের সম্পর্ক নেই।
কেন ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখা হয়?
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট ঝড়কে সহজে শনাক্ত করা এবং এ সম্পর্কে সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। শুধু অবস্থানাঙ্ক বা কারিগরি পরিচয় ব্যবহার করলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ঝড় সম্পর্কে তথ্য মনে রাখা ও বোঝা কঠিন হতে পারে। পরিচিত একটি নাম ব্যবহার করলে সংবাদমাধ্যম, আবহাওয়াবিদ, উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ মানুষ সহজেই নির্দিষ্ট ঝড়টি শনাক্ত করতে পারেন।
একই সময়ে একাধিক সামুদ্রিক ঝড় তৈরি হলে আলাদা নাম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটির গতিপথ, সম্ভাব্য প্রভাব ও সতর্কবার্তা সম্পর্কে বিভ্রান্তি কমানো যায়। এতে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সহজ হয়।
নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে কী নিয়ম রয়েছে?
ঘূর্ণিঝড়ের নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে সহজে উচ্চারণ করা যায়, মনে রাখা সহজ এবং বিভিন্ন ভাষায় অশোভন বা বিভ্রান্তিকর অর্থ তৈরি করে না—এমন নামকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিটি দেশ তালিকায় একাধিক নাম প্রস্তাব করে এবং নির্ধারিত ক্রমে সেগুলো ব্যবহার করা হয়।
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি নাম ব্যবহৃত হয়ে গেলে সেটি সাধারণত পরবর্তী ঘূর্ণিঝড়ের জন্য পুনরায় ব্যবহার করা হয় না। ফলে তালিকা থেকে পরবর্তী নামটি নেওয়া হয়।
নামের সঙ্গে কি ঘূর্ণিঝড়ের শক্তির সম্পর্ক আছে?
না। ঘূর্ণিঝড়ের নামের সঙ্গে এর শক্তি বা ধ্বংসক্ষমতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। নামটি মূলত ঝড়কে শনাক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। ঝড় কতটা শক্তিশালী হবে, বাতাসের গতি কত থাকবে, কোথায় আঘাত হানবে এবং কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে—এসব নির্ভর করে আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর।
তাই কোনো ঝড়ের নাম পরিচিত বা আকর্ষণীয় হলেই সেটি বেশি শক্তিশালী হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। ঘূর্ণিঝড়ের নামের চেয়ে এর অবস্থান, তীব্রতা, সম্ভাব্য গতিপথ এবং সরকারি সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুধু পরিচিতির জন্য নয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগ নিশ্চিত করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। কোনো ঘূর্ণিঝড়ের নাম শোনার পর নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা, আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা অনুসরণ করা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।
স্বাধীন/সা.এ.