সুনামগঞ্জে প্রায় ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন দুটি সেতুর কাজে বাধা, এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সংসদ সদস্য বলেছেন, সেতুর নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার পর তিনি বিষয়টি দেখতে গিয়েছিলেন।
শফিকুল ইসলাম ইসলাম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী। তিনি সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিরখলা-১ ও সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজের ঠিকাদার। মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দেওয়ার পর বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও একই অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
চাঁদা দাবি ও হুমকির অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে শফিকুল ইসলাম দাবি করেন, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল ও তাঁর লোকজন বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। দাবিকৃত অর্থ না দেওয়ায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও মাধ্যম ব্যবহার করে তাঁর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি, হয়রানি এবং পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
ঠিকাদারের অভিযোগ, গত ২০ অক্টোবর দুই দফায় মুক্তিরখলা-১ সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার সালামপুর সেতুর কাজেও বাধা দেওয়া হয়। এসব ঘটনার তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগ
ঠিকাদারের অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সালামপুর সেতুর নির্মাণকাজ নিয়ে আপত্তি তোলার পর সেখানে কয়েকজন শ্রমিককে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় নির্মাণকাজে ব্যবহৃত রোলারের চালক মনির, পে-লোডার চালক কবির আহমদ ও সাইট ঠিকাদার হোসেন আহমদ আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই।
মামলায় আসামি করার বিষয়েও অভিযোগ
শফিকুল ইসলাম অভিযোগে আরও উল্লেখ করেছেন, গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনের সড়কে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিলের ঘটনায় ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় তাঁকে ৫১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত বছরের ২৮ মার্চ জামালগঞ্জ থানার বেহেলী ইউনিয়নের করালজান বিল গ্রুপ (খ) জলমহালের অন্তর্গত কাবিলার বিল থেকে মাছ চুরির ঘটনায় করা মামলায় তাঁকে ১৩ নম্বর আসামি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন তিনি। এ ঘটনায় তাঁর সিলেটের বাসায় পুলিশ পাঠানো হয়েছিল বলেও দাবি করেছেন ঠিকাদার।
শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, গত ৫ অক্টোবর জেলা যুবদলের এক নেতা ফোন করে তাঁকে হুমকি দেন। পরে ২০ অক্টোবর সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের এক নেতা ফোন করে সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি মীমাংসার জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার সংসদ সদস্যের
তবে ঠিকাদারের তোলা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল। তাঁর দাবি, শফিকুল ইসলামকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না। মঙ্গলবার একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে স্থানীয় লোকজন সালামপুর সেতুর গার্ডওয়াল নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি তাঁকে দেখান।
নুরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি যাচাই করতে বুধবার নির্বাহী প্রকৌশলীকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিনে যাওয়ার কথা ছিল। সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া কিংবা চাঁদা দাবির অভিযোগকে তিনি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, কেউ চাঁদা দাবি বা হুমকি দিয়ে থাকলে তার প্রমাণ দিতে হবে।
বুধবার দুপুরে সালামপুর সেতু পরিদর্শন করেন সংসদ সদস্য। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, স্থানীয় লোকজন কাজের অনিয়ম ও ধীরগতির অভিযোগ করায় তিনি বিষয়টি দেখতে গিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, নির্মাণকাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে। কাজের অনিয়ম ও লুটপাট আড়াল করতেই এসব অভিযোগ করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঠিকাদারকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগের বিষয়ে নুরুল ইসলাম বলেন, মামলা হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। কাউকে হয়রানি করার সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা নেই।
নির্মাণকাজের গতি নিয়ে প্রকৌশলীর বক্তব্য
সালামপুর সেতু পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নির্মাণকাজে অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজের ধীরগতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ঠিকাদারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
চাঁদা দাবি, নির্মাণকাজে বাধা ও শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাজু/নিএ