যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মুসলিম আমেরিকান রাজনীতিকদের ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হচ্ছে। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে লক্ষ্য করে অভিবাসন, অপরাধ, সমাজতন্ত্র ও শরিয়া আইনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচনা করছেন রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনার আড়ালে মুসলিম পরিচয়কে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তবে রিপাবলিকান নেতাদের দাবি, তাঁদের আপত্তি কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে নয়; বরং সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের নীতি ও রাজনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে।
টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনকেন্দ্রিক এক সম্মেলনে বিতর্ক নতুন মাত্রা পায়। সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় টেক্সাসের রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি, মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ এবং টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী জেমস তালারিকোর নাম উল্লেখ করেন।
শরিয়া আইন ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামঘেঁষা রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করার সময় দর্শকসারি থেকে ‘তাকে গুলি করা উচিত’ বলে চিৎকার শোনা যায়। ক্রুজ তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান। তবে তিনি ওই মন্তব্য শুনেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মন্তব্যটি কাকে উদ্দেশ করে করা হয়েছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক সহিংসতার বিরোধিতা নিয়ে আলোচনার মধ্যেই এমন মন্তব্য সামনে আসায় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আবদুল এল-সায়েদ বলেন, এ ধরনের বক্তব্যকে সাধারণ রাজনৈতিক মতবিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সহিংসতার আহ্বান, যার দলমত নির্বিশেষে নিন্দা হওয়া উচিত। মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।
সংগঠনটির মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যার আহ্বানের মতো বক্তব্যের প্রতিবাদ না করলে সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ডালাসের সম্মেলনে টেড ক্রুজের বক্তব্যের অন্যতম বিষয় ছিল শরিয়া আইন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রে শরিয়া আইনের কোনো স্থান নেই এবং এটি মার্কিন সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও রাজ্যে শরিয়া আইন পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার অঙ্গীকার করেন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ধর্মীয় আইন প্রতিষ্ঠার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন আবদুল এল-সায়েদ।
তাঁর বক্তব্য, তিনি কোনো ধর্মীয় আইন রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পক্ষে নন। বরং যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকা উচিত।
রিপাবলিকান কৌশলবিদদের দাবি, মুসলিম পরিচয় নয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানই তাঁদের সমালোচনার মূল লক্ষ্য। রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান সাইটচিকের মতে, বিষয়টি মুসলিমবিরোধিতার নয়; বরং সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধিতা।
তাঁর দাবি, মামদানি ও এল-সায়েদের মতো রাজনীতিকেরা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পরিবর্তিত রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তবে এল-সায়েদ নিজেকে ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে পরিচয় দেন না। তিনি ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সদস্যও নন।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক কৌশলবিদদের আশঙ্কা, মুসলিম রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক প্রচার উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মিশিগানের মতো রাজ্যে, যেখানে মুসলিম ও আরব আমেরিকান ভোটারদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে এ ধরনের প্রচার নির্বাচনী ফলাফলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তাঁদের মতে, অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মতো বিষয়গুলো ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক দিয়ে নির্বাচনী আলোচনাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদকে ঘিরে সমালোচনায় যুক্ত হয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। ডালাসের সম্মেলনে তিনি এল-সায়েদের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের সমালোচনা করেন। ওই পোস্টে ভ্যান্সের পারিবারিক ইতিহাস এবং তাঁর স্ত্রী উষা ভ্যান্সের ভারতীয় অভিবাসী পরিবারের প্রসঙ্গ এসেছিল।
ভ্যান্সের অভিযোগ, পোস্টটিতে তাঁর পরিবারকে অন্যায্যভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে এল-সায়েদের দাবি, তাঁর পোস্টটি ছিল ভ্যান্সের আগের একটি মন্তব্যের জবাব।
এদিকে সিনেটর টেড ক্রুজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’ বা কমিউনিস্ট ও ইসলামপন্থীদের কথিত জোট নিয়েও সতর্ক করেছেন। ডেমোক্র্যাট ও মুসলিম অধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য মুসলিম আমেরিকানদের সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম আমেরিকানদের অংশগ্রহণ ও দৃশ্যমানতা বেড়েছে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি এবং মিশিগানের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ বর্তমানে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত মুসলিম ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে রয়েছেন। তবে মুসলিম রাজনীতিকদের উপস্থিতি শুধু ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতেই সীমাবদ্ধ নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের সেন্টারস ফর মেডিকেয়ার অ্যান্ড মেডিকেইড সার্ভিসেসের প্রশাসক মেহমেত ওজ ২০২২ সালে পেনসিলভানিয়া থেকে রিপাবলিকান পার্টির সিনেট প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিলেন।
বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী গবেষকদের আশঙ্কা, নির্বাচনী প্রচারে ধর্মীয় পরিচয়কে বারবার রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা হুমকির সঙ্গে যুক্ত করা হলে তার প্রভাব নির্বাচনী মঞ্চের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলমান উদ্বেগের মধ্যে ডালাসের সম্মেলনে ‘গুলি করা উচিত’ মন্তব্যটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে রিপাবলিকান নেতারা বলছেন, তাঁদের লক্ষ্য কোনো ধর্মীয় জনগোষ্ঠী নয়। তাঁরা এমন সব নীতি ও রাজনৈতিক দর্শনের বিরোধিতা করছেন, যেগুলোকে মার্কিন সাংবিধানিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর মনে করেন। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে অর্থনীতি, অভিবাসন ও অপরাধের পাশাপাশি ধর্মীয় পরিচয়, শরিয়া আইন এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ভাষাও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক হয়ে উঠছে।
ডালাসের ঘটনা সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মতবিরোধ প্রকাশের ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার সীমারেখা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সূত্র: দ্যা হিল
বাপ্পি/সা.এ