একদিকে পাহাড়ের সবুজ, অন্যদিকে বিস্তীর্ণ বালুচর। মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ জলধারা। সেই জলধারা গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে। ছড়ার বুকে সারি সারি নোঙর করা ছোট ছোট কাঠের নৌকা। দূরে দিগন্তজোড়া সমুদ্র, বালুচরে আছড়ে পড়া ঢেউ আর তীরঘেঁষা গাছপালা। সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতি নিজের হাতে এঁকেছে এক নিভৃত ক্যানভাস।
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানী এলাকায় দেখা মেলে এমনই এক মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের। পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট্ট একটি ছড়া এখানে এসে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। পাহাড়, ছড়া, বালুচর ও সমুদ্রের এমন মেলবন্ধন উপকূলের চিরচেনা সৌন্দর্যকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে থাকা এই জায়গাটি যেন প্রকৃতির নিজস্ব এক শান্ত আশ্রয়।
ছড়ার শান্ত জলে নোঙর করে আছে মাছ ধরার ছোট ছোট নৌকা। কোনোটি তীরের কাছাকাছি, কোনোটি আবার ছড়ার মাঝামাঝি। কালচে কাঠের তৈরি নৌকাগুলো দেখতে অনেকটা উপকূলীয় জনপদের ঐতিহ্যবাহী জলযানের মতো। নৌকাগুলোর উপস্থিতিতে জায়গাটির সৌন্দর্য আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মনে হয়, প্রকৃতির এই নিসর্গের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রাও মিশে আছে নিবিড়ভাবে।
সকালের আলো কিংবা দুপুরের রোদে ছড়ার পানিতে তৈরি হয় আলোর বিচিত্র খেলা। কখনো জলরাশি নীলাভ, কখনো সবুজের আভা। বালুচরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস আর পানির মৃদু ঢেউয়ে তৈরি হয় এক অন্য রকম আবহ। সমুদ্রের বিশাল জলরাশির পাশে ছড়াটির শান্ত প্রবাহ যেন প্রকৃতির দুই বিপরীত স্বভাবকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়েছে। একদিকে সাগরের বিশালতা, অন্যদিকে ছড়ার স্নিগ্ধতা।
ইনানী বলতেই সাধারণত পর্যটকদের চোখে ভেসে ওঠে পাথুরে সৈকত, নীল সমুদ্র আর মেরিন ড্রাইভের দুপাশের পাহাড়ি সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের বাইরেও রয়েছে এমন কিছু নিভৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য, যেগুলো অনেকেরই অজানা থেকে যায়। পাহাড়ি ছড়াটির সাগরে মিশে যাওয়ার এই স্থান তেমনই একটি জায়গা। এখানে সমুদ্রকে দেখা যায় একটু ভিন্নভাবে। শুধু ঢেউ আর সৈকত নয়, পাহাড় থেকে নেমে আসা জলধারার সঙ্গে সাগরের মিলনও হয়ে ওঠে দেখার মতো এক অভিজ্ঞতা।
এই ছড়ার সঙ্গে জড়িয়ে আছে উপকূলীয় মানুষের জীবনযাত্রারও এক পরিচিত অনুষঙ্গ। নৌকা এখানে কেবল সৌন্দর্য বাড়ানোর উপকরণ নয়, মানুষের জীবিকা ও দৈনন্দিন চলাচলেরও অংশ। সাগরকেন্দ্রিক জনপদে নৌকা মানেই জীবিকার সংগ্রাম, মাছ ধরার প্রস্তুতি, উত্তাল জলরাশির সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই। তাই ছড়ার বুকে নোঙর করা নৌকাগুলোকে দেখলে প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবনসংগ্রামের কথাও মনে পড়ে।
এখানে প্রকৃতি যেন আলাদা করে কোনো আয়োজন করেনি। নেই কৃত্রিম সাজসজ্জা, নেই চোখধাঁধানো স্থাপনা কিংবা পর্যটকদের জন্য বিশেষ কোনো আয়োজন। বালুচর, জলধারা, নৌকা, গাছপালা আর দিগন্তে মিশে থাকা সমুদ্রই এই জায়গার মূল আকর্ষণ। অথচ এই সাধারণ উপাদানগুলোর সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে অসাধারণ এক দৃশ্যপট।
বিশেষ করে যারা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এমন জায়গা আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। ফটোগ্রাফির জন্যও রয়েছে চমৎকার সম্ভাবনা। ছড়ার পানিতে নৌকার প্রতিবিম্ব, বালুচরের বাঁক, দূরের সমুদ্ররেখা আর আকাশের বিস্তৃতি মিলিয়ে প্রতিটি ফ্রেমেই ধরা পড়তে পারে ভিন্ন ভিন্ন গল্প। একই জায়গা থেকে দিনের বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় আলোর পরিবর্তনে প্রকৃতির নানা রূপ।
তবে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য টিকিয়ে রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলের ছড়া, খাল, বালুচর ও জলপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ অক্ষুণ্ন রাখা না গেলে হারিয়ে যেতে পারে এমন দৃশ্যের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। অপরিকল্পিত স্থাপনা, বর্জ্য ফেলা কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ড থেকে এসব জায়গাকে সুরক্ষা দেওয়া জরুরি। পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি প্রকৃতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
কক্সবাজারের পর্যটন মানচিত্রে ইনানী একটি পরিচিত নাম। কিন্তু ইনানীর সৌন্দর্য শুধু সৈকত কিংবা পাথরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ের বুক থেকে নেমে আসা ছোট্ট ছড়াটির সাগরে মিশে যাওয়ার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির সৌন্দর্য সব সময় বিশাল আয়োজনের মধ্যে থাকে না। কখনো কখনো একটি ছোট্ট জলধারা, কয়েকটি কাঠের নৌকা আর এক চিলতে বালুচরই হয়ে উঠতে পারে অপার মুগ্ধতার উৎস।
পাহাড় থেকে ছুটে আসা ছড়াটি শেষ পর্যন্ত হারিয়ে যায় বঙ্গোপসাগরের বিশালতায়। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সৌন্দর্য সহজে হারানোর নয়। ইনানীর এই জল-স্থল-প্রকৃতির মিতালি যেন নীরবে বলে যায়, কক্সবাজার শুধু সমুদ্র দেখার জায়গা নয়, প্রকৃতির অসংখ্য অচেনা গল্প আবিষ্কারেরও এক অনন্য জনপদ।