বগুড়ার গাবতলীতে একটি কলেজের পরিচালনা কমিটি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। একটি মানববন্ধনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সড়কে অবস্থান নেন। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে গাবতলী উপজেলার সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোনারায় ইউনিয়নের তছলিম উদ্দিন তরফদার ডিগ্রি কলেজ থেকে এবার ৪৬ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তাঁদের কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি। ফল প্রকাশের পর থেকেই কলেজের পরিচালনা কমিটি, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ ও শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে উত্তেজনা চলছে। এরই মধ্যে সোনারায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান রাজা মণ্ডলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে আজ সকালে মানববন্ধনের আয়োজন করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুর অনুসারীরা।
আয়োজকদের অভিযোগ, বক্তারা বক্তব্য দেওয়া শুরু করলে বর্তমান সংসদ সদস্য মোরশেদ মিল্টনের অনুসারীরা সেখানে গিয়ে ব্যানার ও ফেস্টুন কেড়ে নেন। এ নিয়ে প্রথমে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়, পরে তা ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোলে রূপ নেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে মোরশেদ মিল্টনের অনুসারীরা মানববন্ধনের বক্তব্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেন। মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সোনারায় ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল হালিম।
তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারে মানুষের দ্বারে দ্বারে গেলে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের নানা অভিযোগ শুনতে হয়। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন সনদ ও নিবন্ধন নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী সংসদ সদস্যের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তিনি। মানববন্ধনের বক্তারা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও তোলেন। তাঁদের দাবি, পরিষদ থেকে বিভিন্ন সেবা নিতে গেলে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়; বিশেষ করে সনদ ও নিবন্ধনের জন্য ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রাজা মণ্ডল বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
তিনি জানান, পরিষদে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হিসাব সহকারী রয়েছেন, তাঁদের কাছে খোঁজ নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ বা তাঁর সংশ্লিষ্টতা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। কলেজের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৪৭ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস না করায় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে তাঁরা আগে মানববন্ধন করেছিলেন। পরে কলেজের গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। ওই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানাতেই তাঁরা আজ অবস্থান নিয়েছেন।
এদিকে কলেজের শিক্ষক ও অভিভাবকদের একাংশের অভিযোগ, পরিচালনা কমিটি নিয়ে বিরোধ ও শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের কারণে কলেজের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তাঁদের দাবি, নিয়মিত পাঠদান না করে অনেক শিক্ষক দলাদলি ও রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ নামমাত্র হাজিরা দিয়ে বাজারে আড্ডা দেন।
এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গেলে অভিভাবকদের হয়রানি ও লাঞ্ছিত করা হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের। কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ নিয়োগ ও পরিচালনা কমিটির বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। রাজি না হওয়ায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, নিয়োগ বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অনিয়মের সময় তাঁকে বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট পরিবারের একজনকে অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগের সুযোগ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। আমিনুল ইসলামের অভিযোগ, এক চিঠির মাধ্যমে তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাকিব হাসান বলেন, এক পক্ষ মানববন্ধন করতে গেলে অপর পক্ষ বাধা দেয়। এতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।