বিশ্বাসের জায়গা থেকেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ম্যানেজার। মালিকের অনুপস্থিতিতে কেনাবেচা, ব্যাংকে টাকা জমা, গ্রাহকদের কাছ থেকে বকেয়া আদায়সহ প্রায় সব আর্থিক কার্যক্রম ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। সেই সুযোগে প্রতিষ্ঠানের গোডাউন নিজের নামে ভাড়া নেওয়ার জাল চুক্তিপত্র তৈরি, পৃথক ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ এবং একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব হিসাব ব্যবহার করে মালিকের অগোচরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ কোটি টাকা।
কক্সবাজারের ঈদগাঁও স্কুল মার্কেটের ‘মেসার্স জামান পলিথিন স্টোর’-এর সাবেক ম্যানেজার মো. মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর আর্থিক জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন স্বত্বাধিকারী আশরাফুজ্জামান বাবু।
তার দাবি, ম্যানেজার, তার স্ত্রী ও দুলাভাইয়ের যোগসাজশে পাঁচটি ব্যাংক হিসাবে মোট ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ২৬০ টাকা স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়া হলেও বাকি অর্থের হদিস নেই। শুধু অর্থ সরানোই নয়, প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় ৯৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকার দেনা সৃষ্টি এবং গ্রাহকদের কাছে ৪৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা বকেয়া রাখার অভিযোগও রয়েছে। ঘটনার পর দায় স্বীকার করে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করলেও দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার মাত্র দুই দিনের মাথায় কর্মস্থল ছেড়ে চলে যান মহিউদ্দিন।
এ ঘটনায় আশরাফুজ্জামান বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেছেন। অভিযুক্ত মহিউদ্দিন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ পশ্চিম মুহুরীপাড়ার মৃত আবুল হোসেনের ছেলে।
আশরাফুজ্জামানের অভিযোগ, তার বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তিনি সুনামের সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে চাকরিসংক্রান্ত প্রয়োজনে তাকে দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামে থাকতে হতো। এ কারণে সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কর্মচারী মহিউদ্দিনকে। মালামাল কেনাবেচা, বিক্রির টাকা গ্রহণ, ব্যাংকে জমা, গ্রাহকদের বকেয়া আদায় এবং ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ ছিল তার হাতে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়লব্ধ অর্থ ও গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা টাকার একটি বড় অংশ নির্ধারিত হিসাবে জমা না দিয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুরু করেন মহিউদ্দিন। পরে অর্থের লেনদেন আড়াল করতে প্রতিষ্ঠানের গোডাউন নিজের নামে ভাড়া নেওয়ার একটি জাল চুক্তিপত্র তৈরি করেন।
শুধু তাই নয়, ওই ভুয়া চুক্তিপত্র দেখিয়ে ২০২৪ সালে ৪ নম্বর ঈদগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ‘মেসার্স আনান এন্টারপ্রাইজ’ নামে পৃথক ট্রেড লাইসেন্স নেন তিনি। লাইসেন্সটি ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে ইসলামী ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের ঈদগাঁও শাখায় দুটি চলতি হিসাব খোলেন মহিউদ্দিন। নিয়মিত নবায়নও করা হয় লাইসেন্সটি। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর ৮৮৫ নম্বর লাইসেন্সটি নবায়ন করা হয়েছে। নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন পরিচালনার আড়ালে পৃথক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তৈরি করে অর্থ স্থানান্তরের পথ তৈরি করেন তিনি।
আশরাফুজ্জামানের অভিযোগে উল্লেখ করা পাঁচটি ব্যাংক হিসাবের বিবরণে দেখা যায়, ‘মেসার্স আনান এন্টারপ্রাইজ’ এবং মহিউদ্দিন ও তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা ও স্থানান্তর হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখিত হিসাবগুলো হলো- ইসলামী ব্যাংকে ‘মেসার্স আনান এন্টারপ্রাইজ’-এর চলতি হিসাবে প্রায় ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকা; পূবালী ব্যাংকে একই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রায় ৪১ লাখ ২৯ হাজার টাকা; মহিউদ্দিনের স্ত্রী মিসকাতুল জান্নাত রিফার নামে ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবে প্রায় ৪৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা; মহিউদ্দিনের নিজের নামে ইউনিয়ন ব্যাংকের হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৬৯ লাখ ৫৯ হাজার টাকা এবং পূবালী ব্যাংকে তার আরেকটি হিসাবে প্রায় ২৯ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এসব হিসাবে ৭ কোটি ৭৭ লাখ ৯৪ হাজার ২৬০ টাকা স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন আশরাফুজ্জামান।
তার অভিযোগ, এর বাইরেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে আরও অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মহিউদ্দিনের স্ত্রী মিসকাতুল জান্নাত রিফা গৃহিণী এবং তার নিজস্ব আয়ের উৎস নেই।
অভিযোগে বলা হয়েছে, স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করেও প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরানো হয়েছে। স্বামীর আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জেনেও তিনি অর্থ গ্রহণ ও সংরক্ষণে সহযোগিতা করেছেন। আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগও করেছেন তিনি।
আশরাফুজ্জামানের ভাষ্য, প্রায় ৪০ লাখ টাকা মহিউদ্দিন তার দুলাভাই আবদুল শুক্কুরের মাধ্যমে ঈদগাঁওয়ের ইসলামপুর এলাকায় লবণের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। অর্থের প্রকৃত উৎস জানার পরও আবদুল শুক্কুর তা গ্রহণ করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন এবং উৎস গোপন রাখতে সহযোগিতা করেছেন। আত্মসাতের অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থের মধ্যে মহিউদ্দিন তিন দফায় ৩০ লাখ টাকা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ফেরত দিয়েছেন। তবে বাকি ৭ কোটি ৪৭ লাখ ৯৪ হাজার টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি।
অন্যদিকে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মালিকের অজ্ঞাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মালামাল কিনে প্রায় ৯৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকার দেনা সৃষ্টি করেন। একই সময়ে বিভিন্ন ক্রেতার কাছে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে। ফলে বিপুল অঙ্কের অর্থের হিসাব মিলছে না, অন্যদিকে সরবরাহকারীদের কাছে জমেছে দেনা। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে বলে দাবি মালিকের।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন সূত্রে ‘মেসার্স আনান এন্টারপ্রাইজ’ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে জানতে পারেন আশরাফুজ্জামান। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মহিউদ্দিন আর্থিক অনিয়মের কথা স্বীকার করে কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট দেন। সেগুলো ও প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র পর্যালোচনা করে বড় ধরনের আর্থিক অসংগতি দেখতে পান তিনি। পরে প্রতিষ্ঠানের যাবতীয় হিসাব বুঝিয়ে দিতে বলা হলেও মহিউদ্দিন তা যথাযথভাবে করতে পারেননি।
আশরাফুজ্জামানের দাবি, গত ৯ অক্টোবর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মহিউদ্দিন আত্মসাতের দায় স্বীকার করে একটি অঙ্গীকারনামা ও দায়স্বীকারপত্রে স্বাক্ষর করেন। সেখানে ৯৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকার দেনা ব্যক্তিগত দায় হিসেবে স্বীকার করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্রেতার কাছে প্রতিষ্ঠানের বকেয়া আদায় করে নির্ধারিত ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। শর্ত ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে বলেও সম্মত হন। জামানত হিসেবে ইউনিয়ন ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংকের দুটি স্বাক্ষরিত চেক জমা দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, অঙ্গীকারনামার পর প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পুনরায় বুঝে দেওয়া হলে মাত্র দুই দিন ব্যবসা পরিচালনা করেন মহিউদ্দিন। এরপর কোনো নোটিশ ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত হয়ে পড়েন। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং নতুন করে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
ঘটনার পর আইনগত প্রতিকার চেয়ে ঈদগাঁও থানাকে লিখিতভাবে বিষয়টি অবহিত করেন আশরাফুজ্জামান। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব জব্দ বা অবরুদ্ধ করে অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম জসিম উদ্দিন মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে ম্যানেজার মহিউদ্দিন বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তার নিজেরও ৩৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ ছিল। তার কোনো বাড়িঘর নেই। বাড়ি নির্মাণের জন্য সেখান থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন। পরে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের জিম্মি করে স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষর করা চেক নিয়ে নেওয়া হয়।
তিনি দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সঠিক নয়।