বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে সামনে আসছে তার জীবনের শেষ রাতের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ, বারে মদ্যপান, টঙ্গীতে গিয়ে হেরোইন সেবন এবং পুলিশের উপস্থিতিতে বন্ধুর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা উঠে এসেছে জিজ্ঞাসাবাদে। রিমান্ডে থাকা তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্য এবং ফরেনসিক বিভাগের প্রাথমিক অনুসন্ধানে মৃত্যুর বেশ কিছু তথ্য মিললেও কীভাবে তিনি পানিতে পড়ে মারা গেলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে দীপ জানিয়েছেন, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৮ মিনিটের দিকে তাহসিফ, দিশা ও তিনি উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের নেস্ট বারে যান। এর কয়েক দিন আগে দিশা অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন এবং তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন বলে জানতে পারেন তাহসিফ। বিষয়টি জানার পর মন খারাপ ছিল তার। এ কারণে সেদিন দিশাকে নিয়ে বারে যান তিনি।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, বারে গিয়ে তাহসিফ কর্তৃপক্ষকে বিষণ্ন সংগীত বাজানোর অনুরোধ করেন। পরে তিনজনই মদ্যপান করেন। রাত ১২টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থানকালে দিশার সঙ্গে তাহসিফের কথা-কাটাকাটি হয়। অন্য এক যুবকের সঙ্গে ইয়াবা সেবন ও রাত কাটানোর বিষয়টি নিয়ে দিশাকে প্রশ্ন করেন তিনি। একপর্যায়ে তাহসিফ বলেন, ‘তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় কিছু খাব। আমি হেরোইন খাব।’
দিশাকে বাসায় পৌঁছে টঙ্গীর পথে
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ জানান, রাত ১২টার দিকে তিনজন বার থেকে বের হন। পরে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে দিশাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তাহসিফ ও দিশা দুজনই উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে থাকতেন। প্রায় এক বছর ধরে তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। তাহসিফের মোবাইল ফোন বিশ্লেষণ করে তাঁদের যোগাযোগ ও বিভিন্ন বার-রেস্টুরেন্টে যাতায়াতের তথ্য পাওয়া গেছে।
দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ টঙ্গী বাজার বস্তিসংলগ্ন একটি মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাহসিফ নিজেই নিয়েছিলেন বলে তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন দীপ।
দীপের ভাষ্য, মাঠের পাশে বস্তির কাছে তাঁরা মোটরসাইকেল রেখে ভেতরে যান। সেখানে স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারিদের উপস্থিতি ছিল। মাঠে গিয়ে তাহসিফ উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, ‘কার কার কাছে হেরোইন আছে, নিয়ে আসো। যত টাকা লাগে আমি দেব।’ পরে কয়েকজন মাদক কারবারির কাছ থেকে মাদক কিনে সেবন করেন তিনি।
দীপের দাবি, বারে মদ্যপানের পর মাঠে গিয়ে মাদক সেবন করায় তাহসিফ নিজের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
পুলিশের ধাওয়ায় আলাদা হয়ে যান দুজন
দীপ তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান, মাঠে তাহসিফ যখন মাদক সেবন করছিলেন, তখন পুলিশের একটি টহল দল সেখানে পৌঁছায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। একই সময়ে দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান। পরে নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকেন তিনি। এ সময় তাহসিফের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছিন্নতা ঘটে।
দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই থেকে তিন মিনিট পর পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ঘিরে ধরেন। নাম-পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজের পরিচয় দেন এবং বাসার ঠিকানা মোহাম্মদপুর জানান। পুলিশ তাঁকে এত রাতে সেখানে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু এবং একটি কাজে এসেছেন।
পুলিশ সদস্যরা তাঁকে বাসায় চলে যেতে বললেও তিনি তাঁদের পেছনে না গিয়ে বস্তির একটি সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
কেন নিজেকে ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু পরিচয় দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে দীপ বলেন, বিভিন্ন প্রয়োজনে তিনি প্রায়ই এই পরিচয় ব্যবহার করেন। এমনকি ট্রাফিক পুলিশ আটকালে নিজেকে বাহিনীর ক্যাপ্টেন বলেও পরিচয় দেন। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতেই সেদিন রাতেও একই পরিচয় ব্যবহার করেছিলেন বলে দাবি তাঁর।
দীপ আরও জানান, বস্তির ভেতরে পথ হারিয়ে ফেললে এক মাদকসেবীর সহায়তায় মূল সড়কে ফিরে আসেন। পরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে তাহসিফকে একাধিকবার ফোন করেন। কিন্তু প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান।
তাঁর ধারণা হয়েছিল, তাহসিফ হয়তো কোথাও বসে মাদক সেবন করছেন। এর আগে তাহসিফ তাঁর কাছ থেকে ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য একটি পাওয়ার ব্যাংক নিয়েছিলেন। তাই ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণেও সেটি বন্ধ থাকতে পারে বলে মনে করেছিলেন তিনি।
দীপের দাবি, তাহসিফ বাহিনীতে চাকরি করেছেন এবং অনেক স্মার্ট। তিনি সবকিছু সামলে নিতে পারবেন ভেবে নিজের মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন। তবে তাহসিফকে পানিতে পড়তে দেখেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।
হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনার ধারণা তদন্তকারীদের
দীপের বক্তব্য পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য কি না, তা নিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। তাহসিফের মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। বারের সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্যও পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের মোবাইল ফোনও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলে মনে হচ্ছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তাঁর ধারণা, পুলিশের উপস্থিতিতে পালানোর চেষ্টা করার সময় মাদকের প্রভাবে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাহসিফ পানিতে পড়ে যেতে পারেন।
তবে কেউ তাঁকে পানিতে পড়তে দেখেননি। ফলে কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ওই কর্মকর্তা বলেন, দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, মাদক সেবনের কারণে তাহসিফের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তাঁর মাদক সেবনের পূর্ব ইতিহাসও তদন্তে উঠে এসেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রয়োজন।
তাহসিফের মাকে পাঠানো শেষ ভয়েস মেসেজটি কে পাঠিয়েছিলেন, সে বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। দীপের বক্তব্য আরও যাচাই করা হবে এবং তাঁকে ও দিশাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিসিটিভিতে দেখা গেল টঙ্গীর মাঠে যাওয়ার দৃশ্য
এদিকে তাহসিফ ও দীপের টঙ্গী বাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যাওয়ার একটি ভিডিও গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, তাহসিফ বস্তির সরু রাস্তা দিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছেন। তাঁর পেছনে হাতে হেলমেট নিয়ে হাঁটছেন দীপ। এ সময় তাহসিফকে বলতে শোনা যায়, ‘দীপ, ডোন্ট টক টু মাচ, লেটস ওয়াক।’
অন্যদিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফের মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের সময় পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনাও সংগ্রহ করেছে পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, মরদেহটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে পানিতে ডুবেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়।
তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন এবং সাধারণত তাঁর সাঁতার জানার কথা। তাই তিনি এমন কোনো পরিস্থিতিতে পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে সাঁতার কাটার সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারেননি, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, রক্ত, পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি মাদক বা অন্য কোনো নেশাজাতীয় পদার্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না, এমনকি বিষ প্রয়োগের ঘটনা ঘটেছিল কি না, তা জানার চেষ্টা করা হবে।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে বের হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (২৮)। ওই রাতে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে বাসায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। তবে আর ফেরেননি।
রাত ১টার দিকে তাঁর ফোন থেকে মায়ের মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, ‘রওনা দিসি আসতেছি।’
পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর আসে, তুরাগ নদে একটি মরদেহ ভাসছে। পরে টঙ্গী নৌপুলিশ রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রথমে পরিচয় শনাক্ত না হলেও পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তাহসিফের পরিচয় জানা যায়। মরদেহে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে জানায় পুলিশ।
এরপর মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ২৯ অক্টোবর গভীর রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়।
প্রথমদিকে দীপ দাবি করেছিলেন, একটি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। পরে টঙ্গীর মাদক স্পটে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি।
এদিকে ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমে মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করলেও ৩০ অক্টোবর দিবাগত রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এজাহারে তিনি মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এরপর দীপকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় নৌপুলিশ। ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তাহসিফের বাবা সাংবাদিকদের জানান, দীপ প্রথমে তাঁকে বলেছিলেন, ছেলেকে বাসার কম্পাউন্ডে নামিয়ে দিয়েছেন। পরে পিবিআইয়ের কাছে টঙ্গীতে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন। এতে তাঁর সন্দেহ তৈরি হয়।
অন্যদিকে, ঘটনার রাতে তাহসিফের সঙ্গে নেস্ট বারে যাওয়া তরুণী জারিকা তাসনিম দিশাকেও ১ নভেম্বর কাফরুলের একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে নৌপুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধেও সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ ও তাহসিফের ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং ঘটনার রাতে একসঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার তথ্য পেয়েছেন।
সব মিলিয়ে তাহসিফের জীবনের শেষ রাতের ঘটনাপ্রবাহ, মাদক সেবন, পুলিশের উপস্থিতিতে দীপের পালিয়ে যাওয়া এবং এরপর তাঁদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়গুলো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। তবে তাহসিফের মৃত্যু দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্ত, ভিসেরা ও রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।