যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা। বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের কারণে সমালোচনায় থাকা নেতারা এ ফলাফলকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তবে নির্বাচনের ফলাফলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, ইরান যুদ্ধ কিংবা ইউক্রেন নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে তাঁদের।
বুধবার (৫ নভেম্বর) বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা আশা করছেন, নির্বাচনের ফলাফল ওয়াশিংটনকে আরও সহযোগিতামূলক পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণে উৎসাহিত করবে। তবে ট্রাম্পের হাতে আরও দুই বছর ক্ষমতা থাকায় দ্রুত নীতিগত পরিবর্তনের আশা করছেন না অনেকেই।
স্পেনের সামাজিক গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, মার্কিন ভোটাররা ঘৃণা, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকার এবং অভিজাতদের বিশেষ সুবিধার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
তিনি আরও লেখেন, ব্রাজিলে এমনটা ঘটেছে, যুক্তরাষ্ট্রেও ঘটল। শিগগিরই স্পেনেও এমন পরিবর্তন আসবে।
নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এইডে বলেন, অধিকাংশ মার্কিন ভোটার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে তাঁরা ‘মাগা’ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) রাজনীতিতে বিরক্ত এবং এখন ভিন্ন পথ চান। তাঁরা রাজনৈতিক মেরুকরণের অবসান চান।
ইরান যুদ্ধের অবসান চান বিশ্বনেতারা
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম আশা প্রকাশ করেছেন, নির্বাচনের ফলাফল ওয়াশিংটনসহ বিশ্বের বিভিন্ন রাজধানীকে ইরান যুদ্ধের অবসানে আরও মনোযোগী করবে। এ যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যা মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ।
অ্যান্টিগুয়ায় কমনওয়েলথ সম্মেলনে এক সফরের সময় বার্নহাম বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় এখন সবার জন্য বড় সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অবসান না হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমানো সম্ভব নয়।
তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের কথাও উল্লেখ করেন। রাশিয়ার শুরু করা এ যুদ্ধের অবসানেও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইউরোপের উদ্বেগ কাটেনি
তবে ইউরোপের কয়েকটি দেশ সতর্ক করে বলেছে, ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকার আরও দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। অভিবাসন, বায়ুবিদ্যুৎ, শুল্কনীতি ও ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে চাপে ফেলেছে।
অস্ট্রিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিয়াটে মাইনল-রাইসিঙ্গার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, অস্ট্রিয়া ও ইউরোপের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি কানসাস বা আইওয়ার ভোটারদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এ কারণে ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার শক্তি বাড়াচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর আমেরিকা কর্মসূচির পরিচালক লরেল র্যাপ বলেন, ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে দ্রুত কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তিনি মনে করেন না। তাঁর মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই লেনদেননির্ভর এবং ইউরোপের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মূল্য নিয়ে প্রশাসনের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
সতর্ক অবস্থানে কানাডা ও মেক্সিকো
যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও মেক্সিকোও নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাম বলেন, এ বিষয়ে এখনই কিছু বলার সময় আসেনি, অপেক্ষা করে দেখতে হবে।
কানাডার বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ অবসানের আলোচনায় কানাডার অবস্থান শক্তিশালী করবে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
তবে কানাডার অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড ডেমোক্র্যাটদের বিজয়কে কানাডা ও বিশ্বের জন্য ইতিবাচক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এ ফলাফল কানাডাকে আলোচনায় কিছুটা বাড়তি সুবিধা দেবে।
ট্রাম্পের বর্তমান নীতি অব্যাহত দেখতে চায় রাশিয়া
এদিকে রাশিয়া আশা করছে, মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, ট্রাম্প তাঁর বর্তমান শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বুধবার বলেন, নির্বাচনের ফলাফলের বাইরে গিয়ে ট্রাম্প তাঁর শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে রাশিয়া আশা করে।
অন্যদিকে জার্মানির ক্ষমতাসীন মধ্য-ডানপন্থি জোটের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক মুখপাত্র ইউর্গেন হার্ট মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের ভুল পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধেও ভোটারদের অবস্থান তুলে ধরেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ট্রাম্প আরও বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেবেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেন, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে বিশ্বসম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
তবে চ্যাথাম হাউসের লরেল র্যাপ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ট্রাম্পকে নিয়ন্ত্রণ করতে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হলেও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা থাকবে। ফলে নির্বাচনের ফলাফল সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বহাল থাকবে।