দীর্ঘদিনের দাবি ও প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে নতুন অগ্রগতি হয়েছে। পূর্বধলার জারিয়া-ঝাঞ্জাইল রেলওয়ে স্টেশন থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার রেললাইন সম্প্রসারণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা প্রণয়নের উদ্যোগ এখন প্রকল্প যাচাইয়ের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গত মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রেলপথ মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত প্রকল্প যাচাই কমিটির (পিইসি) সভায় এ প্রকল্পের প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (পিএফএস) নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সভার নোটিশেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এতে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত রেল যোগাযোগ নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯ অক্টোবর ‘নেত্রকোনা জেলার ঝারিয়া ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ নকশা প্রণয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের পিএফএসের ওপর প্রকল্প যাচাই কমিটির সভার নোটিশ প্রকাশ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকল্পটির অগ্রগতিতে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগ ও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রেললাইন সম্প্রসারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরছেন।
সরেজমিন পরিদর্শনে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
প্রকল্পটির অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় গত ১৩ মে ২০২৬ তারিখে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগে দুর্গাপুর ও জারিয়া-ঝাঞ্জাইল রেলওয়ে স্টেশন এলাকা পরিদর্শন করেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পরিদর্শনকালে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল স্টেশন থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত প্রস্তাবিত রেলপথের সম্ভাবনা ও প্রয়োজনীয়তা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরে দুর্গাপুরে স্থানীয় সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং রেললাইন সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
ওই সময় রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, রেলপথ সম্প্রসারণ সহজ কোনো কাজ নয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। প্রায় ১২ কিলোমিটার রেলপথ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজন হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনও প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে প্রয়োজনীয় নিয়ম ও প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা জানান।
ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ওই সময় বলেন, রেললাইন সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে দুর্গম ও সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের পাশাপাশি পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে।
১০৮ বছরের পুরোনো স্টেশন, অথচ দুর্গাপুরে নেই রেল যোগাযোগ
জারিয়া-ঝাঞ্জাইল রেলওয়ে স্টেশন থেকে দুর্গাপুরের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। এত কাছে রেল যোগাযোগের অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও দুর্গাপুরবাসী সরাসরি রেলসেবা থেকে বঞ্চিত। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ১৩ মে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় জারিয়া-ঝাঞ্জাইল স্টেশনের ১০৮ বছরের ইতিহাসের কথা তুলে ধরে বলেন, এত বছর পরও এ অঞ্চলের মানুষ রেললাইন দেখলেও রেলে যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছেন না।
এই দিন রেলপথ প্রতিমন্ত্রীও প্রস্তাবিত রেলপথ নির্মাণে সেতুসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। ফলে প্রকল্পটির ক্ষেত্রে শুধু রেললাইন নির্মাণ নয়, বরং সম্ভাব্য রুট, সেতু-কালভার্ট, ভূমি অধিগ্রহণ, কারিগরি নকশা ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বদলে যেতে পারে দুর্গাপুর-কলমাকান্দার অর্থনীতি
রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার মানুষের যাতায়াতব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত সহজ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দুর্গাপুর দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা। বিজয়পুরের সাদামাটির পাহাড়, সোমেশ্বরী নদী, গারো পাহাড় ও সীমান্তবর্তী পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটকের আগমন ঘটে। রেল যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে পর্যটকদের যাতায়াত আরও সহজ হবে। এতে স্থানীয় হোটেল-রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও পর্যটননির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে।
একই সঙ্গে কৃষিপণ্য ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে রেল যোগাযোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। এতে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।